সম্মাননার মঞ্চে নারী

 

আপনাকে আজ মঞ্চে ডাকা হলো। ফুলের মালা পরানো হলো। হাতে একটি ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হলো। আপনার নাম ঘোষণা করে বলা হলো—

 

“আপনি আমাদের গর্ব।”

 

আপনি হাসলেন, ছবি তুললেন। সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করলেন। মানুষ অভিনন্দন জানাল।

 

আর আপনি হয়তো সত্যিই মনে করলেন—
“
আমি সম্মানিত।”

কিন্তু একবার থামুন।

আমি আপনাকে একটি প্রশ্ন করতে চাই—

আপনাকে আসলে কে সম্মানিত করল?

 

একটি রাষ্ট্র?

Ø যে রাষ্ট্র এখনো তার প্রতিটি নারী নাগরিককে নিরাপদে বাঁচার নিশ্চয়তা দিতে পারেনি?

Ø যে রাষ্ট্র একজন নারীর সম্মানহানি হলে তার পাশে দাঁড়ানোর নিশ্চয়তা দিতে পারেনি?

Ø যে রাষ্ট্রের একজন নারী আজও অন্যায়ের শিকার হলে নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননা— “আমি বিচার পাব।”

 

তাহলে সেই রাষ্ট্র যখন আপনাকে ফুলের মালা পরিয়ে বলে,

“আপনি সম্মানিত”

 

আমার কাছে সেটি সম্মান নয়।

এটি একটি ভয়ংকর ব্যঙ্গ।

 

কারণ আপনি যে সম্মাননা হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরছেন, সেই একই রাতে হয়তো এই দেশের অন্য কোনো মা তার মেয়েকে নিয়ে আতঙ্কে ঘুমাচ্ছেন। এই দেশের কোনো বাবা হয়তো তার মেয়েকে নিয়ে ভয় পাচ্ছেন। কোনো নারী হয়তো নির্যাতনের পর বিচার চাইছেন। কোনো কন্যা হয়তো শুধু স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার অধিকারটুকু চাইছেন।

 

আর....

রাষ্ট্র হয়তো তখন আপনাকে নিয়ে অনুষ্ঠান করছে।

কী অদ্ভুত রাষ্ট্র আমরা তৈরি করেছি!

এক হাতে ফুলের মালা,
অন্য হাতে নাগরিকের নিরাপত্তার প্রশ্ন।

এক হাতে ক্রেস্ট,
অন্য হাতে বিচারহীনতার বোঝা।

একদিকে বলা হচ্ছে—
“
নারী আমাদের গর্ব।”

 

অন্যদিকে সেই নারীরই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ব্যর্থ। আমার প্রশ্ন—আপনি কিসের গর্ব? আপনার নিজের অর্জনের? নিশ্চয়ই তাই না। কিন্তু রাষ্ট্রের? কখনোই না।

কারণ একজন নারী সফল হয়েছে এটি ওই নারীর কৃতিত্ব। কিন্তু দেশের প্রতিটি নারী নিরাপদে বাঁচতে পারছে— এটি রাষ্ট্রের কৃতিত্ব।

 

এই দুটোকে এক করে ফেলবেন না। আপনার হাতে যে ক্রেস্টটি দেওয়া হয়েছে, সেটি আপনার যোগ্যতার স্বীকৃতি হতে পারে। কিন্তু সেটিকে দিয়ে রাষ্ট্র নারীর সম্মান বা মর্যাদা দিয়েছে—এমন দাবি করার কোনো অধিকার তার নেই।

 

আপনাকে সম্মানিত করে তারা নিজেদের সম্মানিত দেখাতে চায়।

আপনার ছবিটা তারা ব্যবহার করবে।

আপনার গল্প বলবে।

 

আপনার সাফল্যকে সামনে রেখে বলবে—

“দেখুন, আমরা নারীর ক্ষমতায়নে কতদূর এগিয়েছি!”

 

কিন্তু আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন— আপনার পাশের বাড়ির মেয়েটি যদি কাল নির্যাতনের শিকার হয়, তখন আপনার এই ক্রেস্টটি তাকে কী দেবে?

আপনার ফুলের মালা?

আপনার উপাধি?

আপনার সম্মাননা সনদ?

কিছুই না।

তাকে তখন রাষ্ট্রের প্রয়োজন হবে।

আইনের প্রয়োজন হবে।

ন্যায়বিচারের প্রয়োজন হবে।

নিরাপত্তার প্রয়োজন হবে।

 

আর সেখানেই রাষ্ট্রের আসল পরীক্ষা। মঞ্চের আলোতে রাষ্ট্রের পরীক্ষা হয় না। রাষ্ট্রের পরীক্ষা হয় অন্ধকার রাস্তায় হাঁটা একজন নারীর পাশে।

রাষ্ট্রের পরীক্ষা হয় থানার দরজায় দাঁড়ানো একজন নারীর সামনে। রাষ্ট্রের পরীক্ষা হয় আদালতে বিচারপ্রার্থী একজন নারীর সামনে।

 

রাষ্ট্রের পরীক্ষা হয় একজন বাবার চোখে, যে তার মেয়েকে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে দেখার অপেক্ষায় থাকে।

সেখানে যদি রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়— তাহলে মঞ্চের এই সম্মাননা আমার কাছে সম্মান নয়।

এটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতার ওপর ফুল ছিটানো।

 

আর যে নারী এই ফুল গ্রহণ করছেন, তাকে আমি অপমান করছি না।

বরং আমি তাকে একটি কঠিন সত্য মনে করিয়ে দিতে চাই—

আপনার হাতে যে ক্রেস্ট, সেটি আপনার মর্যাদা নয়।

 

আপনার মর্যাদা জন্মগত।

আপনার নিরাপত্তা আপনার অধিকার।

আপনার ন্যায়বিচার আপনার অধিকার।

আপনার সম্মান কোনো রাষ্ট্রের দয়া নয়।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

 

আর যে রাষ্ট্র নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করতে পারে না, সে রাষ্ট্র নাগরিককে উপাধি দিয়ে নিজের দায় শেষ করতে পারে না।

 

আজ আপনি সম্মাননা পেলেন।

কাল আপনার নিজের মেয়ে যদি এই দেশের রাস্তায় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে—তখন আপনি কি সেই ক্রেস্টটি তার হাতে তুলে দিয়ে বলবেন,

“মা, ভয় পেয়ো না। তোমার মা সম্মানিত হয়েছে”?

 

—না।

কারণ আপনি জানেন—

ক্রেস্ট মানুষকে রক্ষা করে না। ফুলের মালা মানুষকে রক্ষা করে না। উপাধি মানুষকে রক্ষা করে না।

 

রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে হয়।

রাষ্ট্রকে বিচার দিতে হয়।

রাষ্ট্রকে নিরাপত্তা দিতে হয়।

রাষ্ট্রকে তার নাগরিকের পাশে দাঁড়াতে হয়।

 

আর যে রাষ্ট্র তার মা-বোন-কন্যাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, তাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে না— সে রাষ্ট্রের দেওয়া কোনো সম্মাননা নিয়ে আমার গর্ব হয় না; বরং সেই সম্মাননা আমার কাছে রাষ্ট্রের ব্যর্থতার এক অপমানজনক প্রতীক।

 

আমার প্রশ্ন জাগে— যে রাষ্ট্র তার নারীদের রক্ষা করতে পারে না, সে রাষ্ট্র কোন মুখে তাদের সম্মান দেওয়ার দাবি করে?

আর সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন কেউ বলে—

“আমি গর্বিত, আমি সম্মানিত”—

 

তখন আমার বুকের ভেতর থেকে আরেকটি প্রশ্ন উঠে আসে— আপনাকে সম্মানিত করা হয়েছে, নাকি আপনার হাতে একটি ক্রেস্ট ধরিয়ে দিয়ে এই জাতির ব্যর্থতাকে ঢেকে দেওয়া হয়েছে?

 

কারণ সত্যিকারের সম্মান সেদিন হবে—যেদিন কোনো নারীকে নিজের সম্মান প্রমাণ করার জন্য মঞ্চে উঠতে হবে না।

 

সে শুধু একজন নাগরিক হিসেবে নিরাপদে বাঁচবে।

ন্যায়বিচার পাবে, মর্যাদা নিয়ে ঘরে ফিরবে।

 

 

 

 

 

 

THE END.